
সখিপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি: প্রায় পঞ্চাশ একর জায়গায় জুড়ে নয় হাজার টক বড়ইয়ের গাছ রয়েছে কৃষক মোসলেম উদ্দিনের বড়ই বাগানে। টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানি-ঘাটাইল সীমান্ত এলাকায় বড়ই বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। প্রায় এক যুগ ধরে দেশীয় আগাম জাতের টক বড়ই চাষ করছেন তিনি। বড়ই বাগানের আগে তিনি লেবু বাগান করেছিলেন। লেবু বাগান থেকেও তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। তাকে দেখে এলাকার অনেক তরুণ যুবকরা লেবু বাগান করতে আগ্রহী হয়েছেন। সুদীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে কৃষির মাঝেই কাটিয়েছেন জীবনের সিংহভাগ সময়। ধ্যান জ্ঞানের কৃষিই কৃষক মোসলেম উদ্দিনের ভাগ্যের পরিবর্তন, জীবনের সফলতা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা এনে দিয়েছে। আগাম টকবড়ইয়ের বাগানের প্রতিটি গাছেই প্রচুর পরিমাণে বড়ই ধরেছে। কৃষক মোসলেম উদ্দিন এ বছর প্রায় কোটি টাকার মতো বড়ই বিক্রির আশা করছেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে। মোসলেম উদ্দিন এখন অন্যান্য কৃষক ও তরুণদের কাছেও অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর বড়ই বাগান দেখে অনেকেই বড়ই চাষে আগ্রহী হয়েছে।
বড়ই বাগানের চারদিকে যতদূর চোখ যায় সবুজ রঙয়ের বড়ই গাছে ঝুলছে টক বড়ই। বাগানের ভেতর ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক মোসলেম উদ্দিন ও শ্রমিকরা। কেউ গাছ থেকে বড়ই পাড়ছেন, কেউ পানি দিয়ে ধুয়ে বড়ই ঝুড়িতে তুলছেন, আবার কেউ ওজনের নিক্তিতে বড়ইয়ের বস্তা ওজন করছেন, কেউ বড়ই বস্তায় ভরে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছে। মোসলেম উদ্দিনের বড়ই বাগানের এসব বড়ই ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বেপারী মহাজনরা বড় বড় পাইকারি বাজারে বিক্রি করার জন্য পাইকারি মূল্যে কিনে নিয়ে যায়। এছাড়াও তাঁর বড়ই বাগানের টক বড়ইয়ের চাহিদা রয়েছে দেশের বিভিন্ন কোম্পানির কাছেও। প্যাকেটজাত আচার তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কৃষক মোসলেম উদ্দিনের কাছ থেকে টক বড়ই ক্রয় করে।সরেজমিন পরিদর্শন ও কৃষক মোসলিম উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম, মেধা, মনন, ধৈর্য্য ও পরিকল্পনার মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে তীলে তীলে তিনি গড়ে তুলেছেন এই বড়ই বাগান। আগস্ট মাসের শুরু থেকেই তাঁর বাগানের আগাম টক বড়ই বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। প্রতিদিন বাগানে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। বড়ই বাগানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। বড়ই বাগান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ বস্তা বড়ই ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারে বিক্রি করা হয়। প্রতিটি বস্তায় থাকে প্রায় ৫০-৬০ কেজি পর্যন্ত বড়ই। বর্তমানে প্রতি কেজি আগাম টক বড়ই ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বড়ই বিক্রি করছেন কৃষক মোসলেম উদ্দিন। আগাম সময়ে ও বড়ইয়ের ভরা মৌসুম জুড়ে প্রায় এক কোটি টাকার বড়ই বিক্রি করবেন বলে আশা করছেন কৃষক মোসলেম উদ্দিন।
কৃষক মোসলেম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের বেকার তরুণ-তরুণীরা বড়ই, লেবু, মাল্টা, কলা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ফলজ বাগানের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করতে পারেন। বাংলাদেশের মাটি বড়ই সহ অন্যান্য ফল চাষের জন্য খুবই উর্বর। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে অবশ্যই কৃষিতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। ত্রিশ বছরের কৃষিজীবনে নানা রকমের ফসল চাষ করলেও আগাম টক বড়ই আমাকে এনে দিয়েছে ভাগ্যের পরিবর্তন, আর্থিক সচ্ছলতা ও সাফল্যের চাবিকাঠি । আমার ৫০ একর বড়ই বাগান এখন শুধুই ফলের বাগান নয় বরং এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা ও কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম ও একটা অনুপ্রেরণার ক্ষেত্র পরিধি।
গজারিয়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রাজিব সিকদার বলেন, কৃষক মোসলিম উদ্দিন আমার অনুপ্রেরণার অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব।আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে অনার্সে ভর্তি হলাম তারপর আমি আর্থিক অভাব অনটনের মধ্যে পড়ে যাই। তখন চিন্তা করলাম কিছু একটা করা দরকার বসে না থেকে। পরে কৃষক মোসলেম উদ্দিনের কৃষি সেক্টরে যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন মূলত এ ভাবনা থেকেই আমি লেবু বাগান করে সফলতা পেয়েছি। গত ৪-৫ বছর যাবৎ আমি লেবু বাগান করে লেবু বিক্রির মাধ্যমে আর্থিকভাবে সচ্ছলতা অর্জন করেছি। ছোট মৌশাগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, আমি জমি লিজ নিয়ে পৌরসভার কাহারতা এলাকায় কলা বাগান করেছি। কলাবাগান করে বেশ সফলতা পেয়েছি। বিশেষ করে কৃষক মোসলেম উদ্দিন আমাদের সখিপুর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অনুপ্রেরণার অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব। তাকে দেখে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা ও কৃষকরা কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন বলেন, দেশি জাতের টক বড়ই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে কৃষক মোসলেম উদ্দিন সফলতা অর্জন করেছেন। সখিপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এবং তাদের চাষাবাদে সহযোগিতা করতে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের সহায়তা সবসময়ই চলমান রয়েছে।সখিপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম শওকত আলী মাস্টার বলেন, তরুণ উদ্যোক্তা কৃষক মোসলেম উদ্দিন আমার প্রিয় একজন মানুষ।তিনি খুবই কর্মঠ মানুষ। দীর্ঘদিন যাবৎ মনোযোগ দিয়ে কৃষিকাজের মাধ্যমে তার জীবনের সফলতা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করেছেন। তাকে দেখে এলাকার অনেক তরুণ যুবকরাও কৃষিকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তিনি আগে লেবু ও মাল্টা চাষ করতেন। বর্তমানে তিনি টকবরই বাগান করে সাফল্যের ছোঁয়া পেয়েছেন।
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ | |
| ওয়াক্ত | সময় |
|---|---|
| সুবহে সাদিক | ভোর ৫:৪২ |
| সূর্যোদয় | ভোর ৬:৫৮ |
| যোহর | দুপুর ১২:৪৩ |
| আছর | বিকাল ৪:০১ |
| মাগরিব | সন্ধ্যা ৬:২৮ |
| এশা | রাত ৭:৪৪ |